বিপিন চন্দ্র পাল - Rajbari News | রাজবাড়ী নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Wednesday, December 20, 2017

বিপিন চন্দ্র পাল

প্রখ্যাত বাগ্মী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও লেখক ছিলেন বিপিন চন্দ্র পাল। তাঁর জন্ম হবিগঞ্জের তরফ পরগনার পইল গ্রামে ১৮৫৮ সালের ৭ই নভেম্বর। পিতা রাম চন্দ্র পাল বিশিষ্ট উকিল ও ফারসী নবীশ ছিলেন। তাঁর কর্মস্থল ছিল ফেঞ্চুগঞ্জ। বিপিন পাল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, তাঁর লেখাপড়ার হাতে খড়ি হয় পিতা রাম চন্দ্রের নিকট। এরপর তিনি ভর্তি হন সিলেট শহরে প্রাইজ স্কুলে। সুন্দরী মোহন ছিলেন তাঁর সহপাঠী। পরে তিনি চলে যান কলকাতা। ১৮৭৪ সালে হিন্দু বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। কিছুদিন তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যয়ন করেন। সে সময় কলকাতায় ব্রাহ্মধর্মের জোয়ার। ছাত্রাবস্থায়ই বিপিন পাল ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কেশব চন্দ্র সেনের প্রভাবে তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন ও ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। তাঁর সাথী ছিলেন বাল্যবন্ধু সুন্দরী মোহন দাস। তাঁরা রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত বিধবা বিবাহের সমর্থন করেন। দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য বিপিন পাল ও সুন্দরী মোহন বিধবা বিবাহ করেন। ফলে তাঁরা সিলেটে সমাজচ্যুত হন, নিজ নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন ও পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। পরবর্তীতে তাঁর পিতার জীবদ্দশায় তিনি ব্রাহ্মধর্ম ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেন।
১৮৭৭ সালে কলকাতায় ‘শ্রীহট্ট সম্মিলনী’ স্থাপিত হয়। উদ্যোক্তা ছিলেন বিপিন পাল, সুন্দরী মোহন, রাজ চন্দ্র তারা কিশোর, রাজেন্দ্র চৌধুরীর মতো কলকাতা প্রবাসী সিলেটের যুবকবৃন্দ। সম্মিলনীর উদ্দেশ্য ছিল সিলেটে নারী শিক্ষার বিস্তার, দরিদ্র ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষার জন্য আর্থিক সাহায্য, দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের সাহায্য, গণস্বাস্থ্যের উন্নতি প্রভৃতি জনহিতকর কার্যক্রম।
১৮৮৫ সালে তিনি কলকাতা ইমপিরিয়েল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান নিযুক্ত হন ও ১৮৯৭ সন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। এই সময়ে তিনি প্রচুর লেখাপড়া করেন। ১৮৯৮ সালে বিপিন পাল বিলেত যান এবং ‘ইউনিটারিয়ান সোসাইটির’ বৃত্তি লাভ করেন। তিনি এক বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। পরে তিনি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকা ভ্রমণ করেন এবং বিভিন্ন শহরে বক্তৃতা দেন। সুবক্তা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০০ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন; কলকাতাকে নিজ কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ করেন।
কলকাতা কলেজ স্কোয়ারে বিপিন পালের বাড়িতেই স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম। তাঁর বাগ্মীতা ছিল অসাধারণ। ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায়ই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ।
আসামের চা-বাগানের মালিক ছিলেন ইংরেজ সাহেবগণ। তারা চা-বাগানের শ্রমিক অর্থাৎ কুলিদের উপর অকথ্য নির্যাতন করতেন। চা শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ করে। বিপিন পাল কুলিদের পক্ষ সমর্থন করেন। ফলে ১৯০২ সালে তাকে আসাম থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯০৬ সালে অরবিন্দ মামলায় তিনি সাক্ষী দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিপিন পালের ছয় মাসের কারাদন্ড হয়। বিপিন পাল একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই তাঁর বন্ধু সুন্দরী মোহন ও তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলন-
ক. সরকারি চাকরি করব না
খ. বৃটিশের দাসত্ব করব না
গ. প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সঞ্চয় করব না।
ঘ. যথাসাধ্য স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করব।
এই রকম আদর্শবাদী রাজনীতিবিদ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ১৯০৬ সালে তিনি কলকাতা থেকে ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকা প্রকাশ করেন।
বিপিন পাল বাংলা ও ইংরেজিতে অসংখ্য সুচিন্তিত প্রবন্ধ লিখেছেন। পন্ডিত ও সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে আত্মজীবনী লিখে গেছেন। তাঁর বাংলা আত্মজীবনীতে ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগের সিলেটের মনোজ্ঞ বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলি হল-
১. মহারাণী ভিক্টোরিয়া (জীবনী), ২. শোভনা (উপন্যাস), ৩. জেলের খাতা, ৪. মার্কিন দেশে চার মাস ও বিলাতের কথা, ৫. সত্তর বছর (আত্মকথা), ৬. ভারত সীমান্ত রুশ, পইল গ্রামের একজন যোগ্য এবং মেধাবী সন্তান হলেন বিপিন চন্দ্র পাল। আমাদের বৃহত্তর সিলেটের নারী শিক্ষার বিস্তার লাভে তাঁর ‘শ্রীহট্ট সম্মিলনী’ এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে যদিওবা সিলেটের কয়েকজন সম্মানিত লেখক লিখেছেন, তথাপিও বিপিন পালের অবদানকে আমরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি বলে আমি মনে করি। তিনি নিঃসন্দেহে বৃহত্তর সিলেটের একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন। এমন একজন গুণী মানুষ সম্পর্কে আমার কিছু লেখার প্রয়াস হল একটি বিশেষ কারণে। কারণটি হচ্ছে, বিপিন পালের জন্মস্থানেই আমার জন্ম। আমার বাড়ি পইল গ্রামের ‘পইল সাহেব বাড়ি’। ছোটবেলায় আমি বড়দের কাছে তাঁর সম্পর্কে গল্প শুনেছি।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমদুল হক আমার সম্পর্কে দাদা হন অর্থাৎ আমার আব্বার চাচা। তিনি উদ্যোগী হয়ে আমাদের বাড়ির এবং গ্রামের মুরুব্বিয়ানদেরকে নিয়ে পইল গ্রামের কৃতী সন্তান বিপিন চন্দ্র পালের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘বিপিন পাল স্মৃতি সংসদ’ এবং     ‘বিপিন চন্দ্র পাল স্মৃতি পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার সভাপতি হলেন জনাব সৈয়দ আহমদুল হক। ১৯৯৩ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিপিন পালের জন্মবার্ষিকীতে একজন গুণী মানুষকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এভাবে বিপিন পালকে আমাদের গ্রামের মানুষ তাঁর জন্ম জয়ন্তিতে স্মরণ করেন বিগত কয়েক বছর ধরে। আমি আগেই বলেছি, বিপিন চন্দ্র পাল একজন সফল সমাজ সংস্কারক। তিনি নারী শিক্ষার অগ্রসরে ব্যাপক সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তাছাড়া বন্যা দুর্গতদেরকেও ত্রাণ সরবরাহ করেছেন। স্বদেশী আন্দোলনেও তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেক্ষেত্রে তিনি একজন সফল এবং আদর্শ দেশপ্রেমিক। ‘বিপিন পাল স্মৃতি সংসদ’-এর পক্ষ থেকে এই বৎসর গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হয় ইতিহাসবিদ ও গবেষক সৈয়দ আব্দুল্লাহ (তিনি রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বংশের লোক) ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ড. বিবেক দেব রায় কিছুদিন পূর্বে আমাদের পইল গ্রামের বিপিন চন্দ্র পাল স্মৃতি পাঠাগার পরিদর্শন করে গেছেন। উল্লেখ্য যে, তিনিও পাইল গ্রামের একজন সুযোগ্য সন্তান। তাছাড়া শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহর লাল নেহেরু বিপিন পালের মৃত্যুর পর পইল গ্রামে এসেছিলেন বিপিন পালের জন্মস্থানে। আমার আব্বা মরহুম সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম সিলেটের একটি হাইস্কুল (গোটাটিকর দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়, কদমতলি, সিলেট) এর প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সেই সুবাদে আমরা সিলেট শহরে বাস করছি। আমার শেকড় যেহেতু হবিগঞ্জ সদর উপজেলার পইল গ্রামে সেহেতু ঐ গ্রামের প্রতি এবং এর মানুষের প্রতি একটা আত্মার টান সব সময় অনুভব করি। সেই টান থেকেই বিপিন চন্দ্র পাল-এর মত গুণী মানুষের জীবন কর্ম আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
আমি এম.এ এবং ‘সিলেট ল কলেজ’ থেকে এল.এল.বি পাশ করে এখানকার একটি বেসরকারি স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা হিসাবে কর্মরত এবং সিলেট বারে আমার সিনিয়রের সাথে কাজ শিখছি।
আমাদের বাড়িতে যাওয়ার পথে বিপিন চন্দ্র পাল স্মৃতি পাঠাগারটি পাওয়া যায়। সেদিন রাতে বাড়ি থেকে আসার সময় দেখলাম সেই পাঠাগারে বসে অনেকেই বই পড়ছে। সেখানে বিপিন চন্দ্র পালকে নিয়ে লেখা বই রয়েছে যেগুলি পড়লে তাঁর সম্পর্কে তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারবে। আমি মনে করি, বই-ই পারে আমাদেরকে সঠিক জ্ঞানের সন্ধান দিতে। আর তরুণ প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে পাঠাগার বিরাট ভূমিকা পালন করে। পাঠাগার নির্মাণের এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
সমস্ত জীবন দুঃখ দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে তিনি স্বদেশের সেবা করে গেছেন। ১৯২৯ সালের সিলেট-কাছাড়ের বন্যায় দুর্গতদের সাহায্যের জন্য তিনি ও সুন্দরী মোহন সিলেট এবং কাছাড় ঘুরে বহু অর্থ সংগ্রহ করেন। ১৯৩১ সালের দিকে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য তিনি কিছুদিন সপরিবারে সিলেট অবস্থান করেন। তখন তিনি রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্তের অতিথি ছিলেন। ১৯৩২ সালে তিনি ইহধাম পরিত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমপ্তি ঘটে।

Post Top Ad

Responsive Ads Here